Blog
January 24, 2025

হাসিনা বনাম ইউনুস: ট্রাম্প প্রশাসন তাদের উপর কী প্রভাব ফেলবে?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব  নিয়ে মানুষের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। আলোচনায় প্রধানতঃ তিনটি উদ্বেগের বিষয় বেশি শোনা যাচ্ছে:

  • ট্রাম্পের ফিরে আসা কি শেখ হাসিনার বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য সহজ হবে?
  • ট্রাম্প কি ইউনুসকে ডেমোক্র্যাটদের মতোই সমর্থন দেবেন?
  • বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে ট্রাম্প কতটা আগ্রহী হবেন?

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ট্রাম্পের নাটকীয়ভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসা শেখ হাসিনার জন্য মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু লোক বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্পের "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতি বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার নাও দিতে পারে। অন্যদের মতে তার প্রশাসনের অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপ কমিয়ে হাসিনাকে পরোক্ষভাবে উপকৃত করতে পারে। তবে সামগ্রিক প্রভাব অনিশ্চিত রয়ে গেছে এবং ট্রাম্প কী নীতি গ্রহণ করবেন তারই উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ট্রাম্প-শেখ হাসিনা সম্পর্ক: শেখ হাসিনা এবং ট্রাম্প তাদের সময়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তারা ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সম্মেলনের সময় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, যার মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটও ছিল। তখন রয়টার্স-এর সাংবাদিক মিশেল নিকোলসের সাথে একটি সাক্ষাত্কারে শেখ হাসিনা তার সাথে ট্রাম্পের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "ট্রাম্প যখন জাতিসংঘে বিশ্ব সংস্থার সংস্কার নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর সাথে কয়েক মিনিটের জন্য কথা হয়েছিল। তিনি শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বাংলাদেশ কেমন আছে। আমি বলেছিলাম, “ভাল, তবে আমাদের একমাত্র সমস্যা হল মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীরা।'"

শেখ হাসিনা তখন ট্রাম্পের শরণার্থী না নেয়ার নীতির উল্লেখ করে অকপটে স্বীকার করেছেন যে ট্রাম্প রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে কোনো কথা দেননি। ২০২৪ সালে তিনি ট্রাম্পের নেতৃত্বের গুণাবলীকে প্রশংসা করেন এবং তার নির্বাচনী বিজয়ের জন্য তাকে অভিনন্দন জানান।

২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের আগের মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার কারণে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১৭ সালের দ্বিপাক্ষিক তথ্যপত্র অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশি পণ্যের বৃহত্তম বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের জন্য। ২০১৮ সালে, বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। তখন মার্কিন কোম্পানিগুলি বাংলাদেশে বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগকারীও ছিল। ২০১৮ সালের হিসাবে তারা ৩.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা বাংলাদেশে মোট এফডিআই স্টকের ২০ শতাংশ। কোভিড ২০১৯ মহামারী চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৩৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তা প্রদান করেছিল।

প্রফেসর ইউনুসের প্রতি সমর্থন: প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস যিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছেন, ট্রাম্পের অধীনে তিনি ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়ের পর ইউনুস তার হতাশা প্রকাশ করে ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়কে "সৌরগ্রহণ" হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন এবং ট্রাম্পের মেয়াদকে "কালো দিন" হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সম্পর্কে করা মন্তব্যগুলি ভুলে যাননি, এমনকি তার প্রেসিডেন্সির তিন বছর পরেও। যখন ২০১৯ সালে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সাথে দেখা করেছিল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "ঢাকার মাইক্রো-ফাইন্যান্স-এর লোকটি কোথায়?" তিনি আরো, "আমি শুনেছি তিনি আমাকে হারাতে চাঁদা দিয়েছিলেন," মুহাম্মদ ইউনুস তখন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।

এটি আশ্চর্যের কিছু হবে না যদি ট্রাম্প এই সময় ইউনুসের ক্লিনটনদের সাথে গভীর সম্পর্কের আরও আরো খুজ-খবর নেন। ক্লিনটন ফাউন্ডেশন ও ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ থেকে গ্রামীণ আমেরিকা এবং ইউনুসের অন্যান্য আর্থিক উদ্যোগের জন্য তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে হিলারি ক্লিনটনের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে হিলারি ক্লিনটন বারবার তার বন্ধু ইউনুসকে বাংলাদেশের সরকারের প্রধান হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার তীব্র সমালোচনা ইউনুসের প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানের একটি বিশিষ্ট প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসাবে দেখা যেতে পারে। তিনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে হামলাকে "বর্বর সহিংসতা" বলে অভিহিত করেন। যদিও এই সময় ইউনুস তাড়াহুড়ো করে ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন এবং তার অভিনন্দন বার্তায় সহযোগিতার আশা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি অনাগ্রহ: একটি উদ্বেগ রয়েছে যে ট্রাম্প বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী নাও হতে পারেন। তার প্রশাসনের প্রাথমিক ফোকাস সম্ভবত দেশীয় বিষয় এবং প্রধান বৈশ্বিক শক্তিগুলির উপর থাকবে। বাংলাদেশ আসবে অনেক পরে। এর মানে হল ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে আমেরিকার "অতিরিক্ত কার্যকলাপ" যা ডেমোক্র্যাটরা করেছিল তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। নতুন প্রশাসন সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশে কী ঘটছে সে সম্পর্কে খুব বেশি মনোযোগ দেবে না। ফলে অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডেমোক্র্যাটদের কাছ যে সমর্থন পেয়েছিলেন, ট্রাম্পের কাছ থেকে তেমনট না পাওয়াই স্বাভাবিক। এতে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি অনুকুল জায়গা পেতে পারে।