Blog
March 27, 2025

ইউনুস কেন বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করছেন

এ বছর যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে তখন প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব সব কিছু ম্লান করে দিয়েছে।সেই সাথে বিরোধী দলের উপর পদ্ধতিগত হামলা, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং ইতিহাসের সত্যকে জেনে-শুনে আক্রমণ করার কারণে এবারের স্বাধীনতা দিবস আরও কলুষিত হয়েছে। আর এসবেরই কেন্দ্রে রয়েছেন অধ্যাপক ইউনুস, যাকে এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পদ্ধতিগতভাবে বিকৃত করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে— যা অনেকেই জাতির প্রতিষ্ঠার মূলনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসাবে দেখছেন।

ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা নিজেদের ইচ্ছামত লিখে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা খাটো করে করা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে উৎসাহিত করা। এই ইতিহাস বিকৃতি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের মূলে আঘাত করছে। যদি তা মোকাবিলা না করা হয়, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাধীনতার জন্য করা আত্মত্যাগের ইতিহাস মুছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং জাতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণকে আসন্ন পরিচয় সংকট থেকে বাঁচাতে ইউনূসের উদ্দেশ্য এবং তার কর্মকাণ্ডের প্রভাব বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

ইউনূসের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ক্ষুদ্রঋণ থেকে ক্ষমতা দখল

নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত অধ্যাপক ইউনূস তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন। ২০০৭ সালে তার রাজনৈতিক দল নাগরিক শক্তি গঠনের প্রচেষ্টা স্বল্পস্থায়ী ছিল। কিন্তু সমালোচকরা দাবি করছেন যে বিদেশী মদদে পাওয়া তার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব তিনি নানাভাবে প্রলম্বিত করতে চাচ্ছেন- যে প্রচেষ্টার অন্যতম হচ্ছে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা।

ইউনূস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখেননি। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে তার অবদান শুধুমাত্র প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যুদ্ধের পর তিনি বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা কমিশনে কিছু সময়ের জন্য কাজ করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন যেখান থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

ইউনূসের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রথম ২০০৭ সালে নাগরিক শক্তি গঠনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা সমর্থনের অভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ২০২৪ সালে নাটকীয়ভাবে পুনরুত্থিত হয় যখন তিনি একটি ‘সুক্ষ পরিকল্পনার’ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বৈদেশিক সহায়তায় ক্ষমতাচ্যুত করেন। তারপর থেকে তার প্রশাসন বাংলাদেশের ইতিহাসকে পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করছে।

বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যার মাধ্যমে  একটি স্বাধীন বাঙ্গালি জাতি ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পদ্ধতিগত বৈষম্য এবং শোষণের শিকার হয়েছিল।এই প্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্ব তাদের ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে।এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে এক রাতেই অর্ধ লক্ষ বাঙ্গালিকে হত্যা করে। তখনই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হয়।ভারত এ যুদ্ধে সমর্থন জুগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়।

ইউনূস কীভাবে ইতিহাস বিকৃত করছেন?

ঐতিহাসিক বিকৃতির একটি সাধারণ পদ্ধতি হল ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ঘটনা বাদ দেওয়া, তথ্য  এবং ঘটনা পরিবর্তন করা। ইউনূস, তার প্রশাসন এবং তাদের সহযোগিরা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে এবং বঙ্গবন্ধুর ভুমিকা অস্বীকার করে এই পথ অনুসরণ করেছে।

গত বছর ক্ষমতায় আসার পর থেকে অধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রশাসন পাঠ্যপুস্তকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিজেদের মতো করে লেখাসহ বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করেছেন। বর্তমান পাঠ্যপুস্তকগুলো জিয়াউর রহমানকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।জিয়া শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তদুপরি, শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ উপাধি এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার নেতৃত্বের ইতিহাস বাদ দেওয়া হয়েছে। ইউনূসের প্রশাসন দাবি করে যে এই পরিবর্তনগুলো ‘অতিরঞ্জিত’ বা ‘আরোপিত’ ইতিহাস দূর করারই প্রচেষ্টা। তবে সমালোচকরা মনে করেন এই সংশোধনগুলো ইতিহাসের বিকৃতি যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৩২ ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান এবং স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাসের প্রমাণ দেখতে না পায়। এছাড়াও, ইউনূস পরিকল্পিতভাবে এমন রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা উৎসাহিত করছেন যারা শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি, বরং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে নৃশংসতা চালাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিল।

উগ্রবাদীদের ক্ষমতায়ন: স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে ইউনূসের জোট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উগ্র ইসলামী দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে (১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫) বলা হয়েছে যে শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে দমন করা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো ইউনূসের প্রশাসনের অধীনে নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে।

গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রসার

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন পরোক্ষ সেন্সরশিপের অধীনে কাজ করছে, যেখানে সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশের কারণে আক্রমনের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে, ইউনূসপন্থী মিডিয়া আউটলেটগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে এমন বিষয় সক্রিয়ভাবে প্রচার করছে। এবার মার্চ মাসে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের কোনো উল্লেখ ছিলো না। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যাও উপেক্ষা করা হয়েছে।

ইউনুস কেন ইতিহাস বিকৃত করছেন?

ইউনুসের প্রচেষ্টা একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের একটি মৌলিক স্তম্ভ। যদি এটি বিকৃত করা যায় তবে এই বিকৃতি সেই দল ও গোষ্ঠীগুলির জন্য বাংলাদেশে তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হবে।

ইউনুস বিতর্কিত কর্মকাণ্ড রক্ষা করতে তার নোবেল পুরস্কার ব্যবহার করছেন

অগ্রজ কয়েকজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর মতো ইউনুসও নোবেল ব্যবহার করে তার  বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আড়াল করতে চাচ্ছেন। যেমন, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ২০১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রাইয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

একইভাবে, ইয়েমেনের সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী তাওয়াক্কোল কারমান, যিনি গণতন্ত্র ও নারী অধিকারের পক্ষে তার প্রচারের জন্য ২০১১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন, তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে যুক্ত থাকার জন্য সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

মিয়ানমারের অং সান সু চি একই  পথ অনুসরণ করেছিলেন। তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, কিন্তু রোহিঙ্গা গণহত্যার সময় তার নীরবতার জন্য তিনি নিন্দিত হয়েছেন।

ইউনুস এখন এই দলে যোগ দিয়ে তার নোবেল পুরস্কার ব্যবহার করে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করছেন শুধুই নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য।

প্রতিবাদের সময় এসেছে

বাংলাদেশকে অবশ্যই তার ইতিহাসের এই বিকৃতি প্রতিরোধ করতে হবে। ইউনুসের নোবেল পুরস্কার তাকে জাতির গর্বিত ঐতিহ্যকে দুর্বল করার দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। ১৯৭১ সালের চেতনা, আদর্শ ও অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে এখনই এবং এসব চিরতরে মুছে ফেলার আগেই।