Blog
February 05, 2025

ইউনুস সরকারের ৬ মাসঃ মানুষের হতাশা ও শঙ্কা নিয়ে বিবিসি-র প্রতিবেদন

প্রফেসর ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের ৬ মাস পার হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তথাকথিত বৈষম্য নিরসনে তাঁর দেয়া প্রতিস্রুতি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছে না। বরং নিত্যপণ্যসহ জীবন-যাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমঅবনতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘুদের ও সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, ঘুষ-দুর্নীতি এবং মব ভায়োলেন্স-এ জন-জীবন বিপর্যস্ত।

বিবিসি বাকস্বাধীনতা, দ্রব্যমূল্য, ঘুষ-দুর্নীতি, মানবাধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, মন্তব্য ও অভিমত তুলে ধরেছে- যেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে তাদের হতাশা ও ভয়। প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলোঃ

বাকস্বাধীনতা:

"এখন ফেসবুকে কিছু লেখার সময় আগের মতো ভাবতে হয় না। আগে এমনও হয়েছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে কিছু পোস্ট করতে গিয়েও করিনি। ডিলিট করেছি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন দিলশাদ জাহান।

"কিন্তু এখন সেটা নেই। নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারি, ফেসবুকেও লিখতে পারি," বলেন মিজ জাহান।

"সরকার এখন ধরে নিয়ে যাচ্ছে না, সত্যি। কিন্তু অনেক কিছুই এখন বলতে পারছি না মবের ভয়ে," বিবিসি বাংলাকে বলেন রিয়াদুল ইসলাম।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মি. ইসলাম আরও বলেন, "ধরেন, আপনি সরকারের বিপক্ষে ফেসবুকে কিছু লিখলেন। সাথে সাথে দেখবেন একদল আপনাকে আক্রমণ করে বসছে। ফ্যাসিস্টের দালাল তকমা দিচ্ছে।"

"আর ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের নিয়ে কথা বললে রাস্তাঘাটে হামলারও শিকার হতে পারেন। এজন্যও অনেক সময় চুপ থাকতে হচ্ছে," বলেন মি. ইসলাম।

দ্রব্যমূল্য:

"দাম তো কমেই নাই, অনেক ক্ষেত্রে আরও বাড়ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকার ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা আহসান হাবিব।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা এই ব্যক্তি আরও বলছিলেন, ছয় মাস আগে যে চাল তিনি ৫৫ টাকায় কিনতেন, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে দশ টাকা বেশি দিয়ে।

"অথচ আমরা আশা করছিলাম, এখন চালের দাম কমবে। কারণ কিছুদিন আগেই ধান উঠছে," বলেন মি. হাবিব।

একই কথা বলছিলেন ঢাকার রাস্তায় সিএনজি চালক মোহাম্মদ রিপন। উচ্চমূল্যের বাজারে সংসার চালাতে তাকে রীতিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

"সারা দিনে যা ইনকাম করি, মহাজনরে দিয়া পাঁচশ টাকাও থাহে না। এডি দিয়া সংসার চালামু, নাকি পোলা-পানের লেহাপড়ার খরচ দিমু?" বলেন মি. রিপন।

"তাইলে ছাত্ররা যে এতকিছু কইলো, এত আশা দেহাইলো, সেডি সব মিথ্যা?" প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয়েছিল।

নতুন সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর সুদের হার বাড়ানোসহ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানান পদক্ষেপ নেয়।

কিন্তু তারপরও মূল্যস্ফীতি দশ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব হয়নি।

"সোজা কথায়, সরকার কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় নাই," বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী।

সরকার নিজেও অবশ্য সেটি স্বীকার করছে।

"খাদ্যে মূল্যস্ফীতি একটু বেড়েছে। কিন্তু নন-ফুডে আবার কিছুটা কমেছে। সামগ্রিকভাবে বেড়েছে," সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

ঘুষ-দুর্নীতি:

"মনে করছিলাম আর হয়তো ঘুষ দিতে হবে না। কিন্তু এখন দেখি যেই লাউ, সেই কদু," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রেজাউল ইসলাম।

মি. ইসলাম জমি-জমা সংক্রান্ত কাজে সম্প্রতি গিয়েছিলেন ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত ভূমি রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে।

সেখানকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "পার্থক্য শুধু এটুকুই দেখছি যে, আগে কাজ করতে সরাসরি টাকা চাইতো, এখন নিজে থেকে কিছু বলে না।"

"কিন্তু কাজ না করে আপনাকে এমনভাবে ঘুরাবে যে, আপনি নিজেই বুঝে যাবেন ঘুষ ছাড়া কাজ হবে না," বলেন মি. ইসলাম।

একই কথা বলছিলেন ঢাকার পান্থপথ এলাকার ফুটপাথের এক ফল ব্যবসায়ী।

"হাসিনার পলানোর পরের চার মাসে ব্যবসা করার জন্য কাউরে টাকা দিতে হয়নি। কিন্তু গত দুই মাস ধরে পুলিশ আবার টাকা নেওয়া শুরু করছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী।

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বুঝতেই তো পারছেন। ব্যবসা তুলে দিলে তখন ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।"

একইভাবে, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অনিয়ম-দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে।

"আসলে ব্যক্তি বদলেছে, কিন্তু সিস্টেম বদলায় নাই। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সিস্টেম বদলাতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

মানবাধিকার:

দেড় দশকের শাসনামলে শেখ হাসিনার সরকারকে মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।

গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় এগুলো বন্ধ হবে। যদিও বাস্তবে তা ঘটেনি।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২১ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন।

তাদের মধ্যে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে অর্ন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর

সম্প্রতি কুমিল্লায় যৌথ বাহিনী তুলে নেওয়ার পর তৌহিদুল ইসলাম নামে একজন যুবদল নেতার মৃত্যু হয়েছে।

"গণঅভুত্থান পরবর্তী সরকারের সময় এগুলো মোটেও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। এটা মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং প্রচলিত আইনেই এগুলোর দ্রুত বিচার করা উচিত," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।

পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণপিটুনির শিকার হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীসহ অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আদালত প্রাঙ্গণে ঢুকেও দলবেঁধে হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে

"এগুলো আমাদের আতঙ্কিত করছে যে, আবার সেই স্বৈরাচারী আমলের দিকে যাত্রা হচ্ছে কি-না," বলেন মি. লিটন।

আইনশৃঙ্খলা:

একের পর এক ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে রীতিমত আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

"রাতের বেলা তো দূরে থাক, এখন দিনের বেলায়ও পথঘাটে চলতে ভয় হয়। কিছুদিন আগে ভর দুপুরে নিউমার্কেট এলাকা থেকে টান দিয়ে আমার স্বর্ণের চেইন নিয়ে গেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকার আজিমপুরের বাসিন্দা বিলকিস আরা বানু।

একই কথা বলছিলেন ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা উম্মে সালমা হৃদিতা, যিনি জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

"আগে রাত দশটা-এগারোটার সময় একা চলাফেরা করলেও ভয় করতো না। কিন্তু এখন করে। সে কারণে সন্ধ্যার পর সোজা বাড়িতে চলে আসি," বলেন মিজ হৃদিতা।

বর্তমানে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মিজ হৃদিতা চলাচলের বাহন হিসেবে স্কুটি বাইক ব্যবহার করেন। ছিনতাই ছাড়াও এখন তার নতুন ভয়ের কারণ 'মব' হামলা।

"সংবাদে দেখছি, ধর্মীয় উগ্রপন্থী কিছু মানুষ মেয়েদের ফুটবল খেলতে দিবে না বলে ভাঙচুর চালাচ্ছে। নারী সেলিব্রেটিদেরকেও টার্গেট করছে। স্কুটি চালানো বা চাকরি করার কারণে আমি যে এভাবে টার্গেট হবো না, সে নিশ্চয়তা কে দেবে?," প্রশ্ন রাখেন মিজ হৃদিতা।

বিস্তারিতঃ বিবিসি