Blog
February 24, 2025

সিলেট এমসি কলেজের ঘটনা কিসের ঈঙ্গিত

  • সিলেটে তালামীযের সদস্য মিজানুর রহমান রিয়াদকে শিবির কর্মীরা মারধর করে।
  • বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হচ্ছে, এবং রিয়াদের জন্য বিচার দাবি করা হচ্ছে।
  • এই ঘটনা চরমপন্থীদের দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্রের একটি অংশ হিসাবে দেখা হচ্ছে, যা ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ঘটছে।
  • তালামীয ও শিবির উভয়ই ইসলামী সংগঠন হলেও তাদের ভিশন ও মিশন বা উদ্দেশ্য এবং কর্মপদ্ধতি ভিন্ন।
  • ১৯৮০ এর দশকের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় তালামীয যা বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদদের দিক নির্দেশনায় সমাজ ও শিক্ষার আধুনিকায়নের কাজ করে।
  • শিবির পাকিস্তান আমলের কুখ্যাত ছাত্র সংগঠনের উত্তরসূরি, যারা সহিংস ও গণতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত।

সিলেট এমসি কলেজে তালামিয নামের এক ছাত্র সংগঠনের কর্মী মিজানুর রহমান রিয়াদকে শিবির কর্মীদের মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তা ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের ছায়ায় জঙ্গীবাদীদের সুদূরপ্রসারী চক্রান্ততেরই আরেক প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এই জঙ্গিবাদীদের নেতৃত্বে রয়েছে জামাত-শিবিরসহ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি। গত জুলাই মাসে বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে যে আধাসামরিক অভ্যুথান হয়েছে তারও কেন্দ্রে ছিলো এই চক্র।       

তালামিয-এর একজন কর্মীকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা কেন মারধোর করলো? তালামিয ও শিবিরের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? দুটি সংগঠনই আপাতদৃষ্টিতে ইসলামী আদর্শের অনুসারী হলেও বাস্তবে তাদের ভিশন ও মিশন বা উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক। আর এখানেই নিহিত রয়েছে এই দুই সংগঠনের মতভেদ ও সংঘাতের পটভূমি ও লক্ষ্য।   

প্রায় অর্ধশত বছর আগে ১৯৮০ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আঞ্জুমানে তালামীযে ইসলামিয়া নামে এই ছাত্র সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের জকিগঞ্জ-এর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছিলেন এর পৃষ্ঠপোষক। এ সংগঠন বাংলাদেশের বিশিষ্ট উলামায়ে কিরাম, পীর মাশায়িখ ও ইসলামী চিন্তাবিদগণের দিক নির্দেশনায় দেশ ও সমাজসেবামূলক কাজ করছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সাংস্কৃতিক,  সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য-এর প্রতি এই সংগঠন শ্রদ্ধাশীল। এরা সংস্কারের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার আধুনিকায়ন চায়।

অন্যদিকে ইসলামী ছাত্র শিবির হচ্ছে পাকিস্তান আমলের কুখ্যাত ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের উত্তরসূরি। ১৯৭১ সালে এই সংগঠন আল-বদর গঠনে নেতৃত্ব দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর হত্যাকাণ্ডে প্রথমসারির সহযোগী হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতার পর জামাতে ইসলামীর ছাত্র শাখা হিসেবে এই সংগঠনটি সহিংসতা, সশস্ত্র আন্দোলন এবং গণতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্তত রয়েছে। প্রতিপক্ষের অগণিত নেতা-কর্মীর হাত-পায়ের রগ কাটার ঘটনার কারণে সংগঠনটি "রগ কাটা শিবির" নামেও পরিচিত।এসব সবারই জানা বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা আইএইচএস জেন'স "আইএইচএস জেন'স ২০১৩ গ্লোবাল টেররিজম অ্যান্ড ইনসার্জেন্সি অ্যাটাক ইনডেক্স" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই তালিকায় বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সশস্ত্র গ্রুপগুলির প্রথমে ছিল থাইল্যান্ডের বারিসান রেভুলুসি ন্যাশনাল, দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল আফগানিস্তানের তালিবান এবং তৃতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্র শিবির।

গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৪-এ কোনো বাংলাদেশী সংগঠনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ না করা হলেও এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে সহিংস চরমপন্থীরা ২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একই কারণে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ২০২৩ সালের ইনডেক্সের তুলনায় ১৪ স্থান পিছিয়ে ৩২তম স্থানে নেমেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এই চরমপন্থিদের প্রধানই হচ্ছে জামাত-শিবির। আওয়ামী লীগ এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলো। কিন্তু ইউনুস তার সহযোগী হওয়ায় সেই নিসেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই জামাত-শিবির এখন বাংলাদেশে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর এবং এক্ষেত্রে তারা কাউকে কোনো ছাড় বা স্থান দিতে চাচ্ছে না। যে কারণে ইতোমধ্যেই জামাতের সঙ্গে বিএনপি-র এবং শিবিরের সঙ্গে বিএনপি-র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের মতবিরোধ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। একই কারণে তালামিযকেও শিবির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। তালামিযের কর্মী রিয়াদ কুয়েটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদলের সংঘর্ষ নিয়ে ফেসবুকে এক পোস্টে দিয়েছিলো। এত সে কুয়েটে সংঘর্ষের পিছনে শিবিরের সম্পৃক্ততার কথা ঈঙ্গিত করেছে বলে শিবিরের অভিযোগ। আর জন্যেই তার ওপর বর্বর হামলা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। মিছিল শেষে সমাবেশে ছাত্রনেতারা শিবিরকে সহিংস রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই হামলার প্রতিবাদে সিলেট শহরে ছাত্রদল সিলেট শাখার ও বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগরীর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। তারা রিয়াদের ওপর হামলায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি করেছে।সিলেটের সাধারণ মানুষও শিবিরের এই হামলায় জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হয়ে উঠছে। অবস্থা বেগতিক দেখে জামাতের নেতারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কৌশল হিসেবে শিবিরের কয়েকজন কর্মীর ওপর দায়ভার চাপিয়ে এলাকায় নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন। সিলেট জেলা আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম রিয়াদের উপর হামলার ঘটনার দায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।কিন্তু শিবির তা মানতে নারাজ। আমিরের দায় স্বীকারমূলক এমন বক্তব্যে আপত্তি জানিয়েছে ইসলামী ছত্রিশিবিরের সিলেট মহানগর শাখা। হামলার সাথে ছাত্রশিবিরকে জড়িত করার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে  মহানগর আমিরের বক্তব্য প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

অনেকে মনে করছেন জামাতের কিছু নেতার নমনীয়তায় কট্টরপন্থীরা সম্মত নয়। তারাই সিলেটের শিবিরের নেতাদের পাল্টা বিবৃতি দিতে মদদ যুগিয়েছে। এতে জামাতের মধ্যেও জঙ্গিবাদীদের আধিপত্যই সবসময়ের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।আর সিলেটের ঘটনা বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানেরই আরেকটি প্রকট নজীর মাত্র। বর্তমানে এই জঙ্গিবাদিদের পিছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় শক্তি- ইউনুস ও তার সরকার- যারা আওয়ামী লীগ ও ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল দল, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস-সবকিছু ধংস করে বাংলাদেশে আবারো ৭১ পূর্ববর্তী দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।