
যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউজ গত সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলো।
লন্ডন-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. প্যাট্রিক শ্রোডার এবং ড. চিয়েটিজ বাজপাই তাদের এক গবেষণামূলক নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের অর্ধ-শতাব্দীর ইতিহাসে ২৯টি প্রকৃত বা প্রচেষ্টাকৃত অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে।
তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, বর্তমানে সেনাবাহিনী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সহায়তা করার চেষ্টা করছে, তবে সেনাবাহিনী নিজেই ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য, এবং ইউনুস সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা সামরিক শাসনের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেও সামরিক শাসনের আশঙ্কা প্রবল হয়েছে।
বিবিসি বাংলা রিপোর্ট করেছে যে সেনাপ্রধান দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে দেশের ভবিষৎ ও সেনাবাহিনীর অবস্থান ও ভুমিকার একটি দিক-নির্দেশনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গত সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাজ্যের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউজ বাংলাদেশ সামরিক শাসনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলো। লন্ডন-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. প্যাট্রিক শ্রোডার (Dr Patrick Schröder) ও ড. চইতেগি বাজপাই (Dr Chietigj Bajpaee) তাদের এক গবেষণামূলক নিবন্ধে বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারির সংস্কৃতি ও ধারার পর্যালোচনা করে উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের অর্ধ-শতাব্দীর ইতিহাসে ২৯টি প্রকৃত (actual) বা প্রচেষ্টাকৃত (attempted) অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। তারা তখনই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “বর্তমানে সেনাবাহিনী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সহায়তা করার চেষ্টা করছে, তবে সেনাবাহিনী নিজেই ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।”
এখন কি সেই আশংকাই সত্যি হতে যাচ্ছে? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য, দেশ পরিচালনায় ইউনুস সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা, সর্বোপরি দেশের সেনাপ্রধানের হুশিয়ারিতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন-বাংলাদেশে কি সামরিক শাসন আসন্ন? ইউনুস সরকারের ব্যর্থতা কি বাংলাদেশকে সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশে প্রবাসি বাংলাদেশিদের মধ্যে এ প্রশ্ন দিনে দিনে জোরদার হচ্ছে? সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের মধ্যে এ চিন্তা প্রবল হয়ে উঠছে।
বিবিসি বাংলা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে সেনাপ্রধান দেশের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।সর্বোচ্চ দায়িত্ব বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন সেটাই আলোচনার বিষয়। কেউ কেউ মনে করছেন এটা স্পষ্টতই সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক ও পরোক্ষে রাজনীতিকের দায়িত্ব পালনের জায়গাটাকেই বুঝায়।
সাধারণ মানুষের আলোচনায় এটাও উঠে এসেছে যে ইউনুস সরকারের পক্ষপাতিত্ব, দমন-পীড়নের পাশাপাশি নির্যাতন, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, এবং জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেশকে সমূহ অনিশ্চয়তার দিকেই ধাবিত করছে। এহেন সংকট এড়াতে সামরিক শাসন সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে।
সেনাপ্রধান গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন বাংলাদেশ আজ এক ভীষণ ক্রান্তিলগ্নে। কারণ সকল বাহিনী ও সকল প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পিছনে বেশ কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম কারণটা হচ্ছে যে নিজেরা হানাহানির মধ্যে ব্যস্ত। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে ব্যস্ত। আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি।
ইউনুস ও তার উপদেষ্টারা যখন বাংলাদেশকে একটি গোষ্ঠীর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে, তখন সেনাপ্রধান স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাষাতেই বলেছেন, ‘আমি আজকে বলে দিলাম নইলে আপনারা বলবেন যে আমি আপনাদের সতর্ক করিনি।এই দেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি।”
তিনি আরো বলেছেন যে অন্য সমস্ত বাহিনী ও প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও সেনাবাহিনী বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী টিকে আছে এবং তারা ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান থাকবে।
ওই অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান তার একটি লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেছেন আর তার ভাষায় তা হল দেশ এবং জাতিটাকে একটি সুন্দর জায়গায় রেখে ছুটি করা। - আই হ্যাড এনাফ, ফর লাস্ট সেভেন-এইট মান্থস, আই হ্যাড এনাফ (আমার যথেষ্ট হয়েছে, গত সাত-আট মাসে যথেষ্ট হয়েছে)। আমি চাই, দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে আমরা সেনানিবাসে ফেরত আসব।’
তার এই বক্তব্যকে অবশ্যই দেশের ভবিষৎ ও সেনাবাহিনীর অবস্থান ও ভুমিকার একটি অন্যতম দিক-নির্দেশনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে কোনো দেশে সামরিক শাসন কতখানি মঙ্গলজনক হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ প্রশ্ন আরো গুরুতপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই অনেক দেশের ওপর নির্ভশীল যেসব দেশের সরকার ও জনগণ সামরিক শাসকদের পাশে দাড়াতে চায় না।